মাধ্যমিকের পর বহু ছাত্র-ছাত্রীরই সাইন্স নিয়ে পড়ার স্বপ্ন থাকে। কিন্তু সাইন্স নিয়ে পড়লে কি হওয়া যায়? এই প্রশ্ন অনেকের মনেই ঘোরে। সাইন্সে চাকরি মানেই কি শুধু ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার? একসময়ে এই ধারণা প্রচলিত থাকলেও এখন সময় বদলেছে। আধুনিক যুগে বিজ্ঞান বিভাগ মানে কেবল ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং নয়, বরং এখানে বহুমুখী কেরিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে। যেগুলির কোনো কোনোটিতে কম নম্বরেও ভর্তির সুযোগ থাকে। আজকের প্রতিবেদনে উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান শাখায় পাসের পর এইসব বিভিন্ন কেরিয়ার পাথগুলি নিয়েই আলোচনা করা হবে। ছাত্রছাত্রীদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর এই এক প্রতিবেদনেই রয়েছে।
এক নজরে
সাইন্স নিয়ে পড়লে কি হওয়া যায়?
বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে যারা পড়েন, তাদের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেডিকেল লাইন অবশ্যই এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় ও স্থিতিশীল কেরিয়ার। তবে এর বাইরেও এখন অসংখ্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমানের ডিজিটাল যুগে সাইন্স নিয়ে পড়া মানে ভালো কেরিয়ার গড়ার হাজারটি দরজা খুলে যাওয়া।
বিজ্ঞান শাখায় ভর্তির পর কি করা যায়?
ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি (বি.টেক/বি.ই)
বিজ্ঞানের ছাত্রদের কাছে সবথেকে জনপ্রিয় কেরিয়ার হলো ইঞ্জিনিয়ারিং। পশ্চিমবঙ্গ জয়েন্ট এন্ট্রান্স (WBJEE) বা সর্বভারতীয় জয়েন্ট এন্ট্রান্স (JEE Main) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ৪ বছরের বি.টেক বা বি.ই কোর্সে ভর্তি হওয়া যায়। এখানে কম্পিউটার সায়েন্স, ইলেকট্রনিক্স, সিভিল, মেকানিক্যাল বা আইটি-র মতো বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। সরকারি কলেজে (যেমন যাদবপুর বা আইআইটি) পড়ার খরচ ৪ বছরে মাত্র ৫০ হাজার থেকে ২ লক্ষ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বেসরকারি কলেজে এই খরচ ৮ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কোর্স শেষে গুগল, মাইক্রোসফট, টাটা বা রিলায়েন্সের মতো বড় সংস্থায় বছরে ৬ লক্ষ থেকে শুরু করে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বেতনের চাকরি পাওয়ার সুযোগ থাকে। এছাড়াও গেট (GATE) পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি সংস্থা যেমন ওএনজিসি (ONGC) বা কোল ইন্ডিয়াতে উচ্চপদে যোগ দেওয়া যায়।
ডাক্তারি (এমবিবিএস/বিডিএস)
উচ্চমাধ্যমিকে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি ও বায়োলজি থাকলে নিট (NEET) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ৫.৫ বছরের এমবিবিএস বা বিডিএস কোর্সে ভর্তি হওয়া যায়। ডাক্তারি মানেই অত্যন্ত সম্মানজনক এবং দায়িত্বের একটি পেশা। সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ার খরচ খুবই কম, প্রায় ১-২ লক্ষ টাকার মধ্যে পুরো কোর্স শেষ করা সম্ভব, কিন্তু বেসরকারি কলেজে এই খরচ ৩০ লক্ষ থেকে শুরু করে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ডাক্তার হিসেবে কেরিয়ার শুরু করলে শুরুতে মাসে ৬০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা আয় করা যায় এবং স্পেশালাইজেশন করলে আয়ের সীমা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এছাড়াও নিজস্ব ক্লিনিক বা নার্সিং হোমে প্র্যাকটিস করার অবারিত সুযোগ রয়েছে।
ডেটা সায়েন্স ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স
বর্তমান যুগে তথ্যের গুরুত্ব সবথেকে বেশি। গণিত ও কম্পিউটারে দক্ষ ছাত্রছাত্রীরা ৩ বছরের বিএসসি বা ৪ বছরের বি.টেক ইন ডেটা সায়েন্স ও এআই কোর্স করতে পারে। এই কোর্সের খরচ কলেজ ভেদে ৩ লক্ষ থেকে ৮ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হয়। এখনকার দিনে দাঁড়িয়ে এটি সবথেকে বেশি বেতনভোগী পেশাগুলোর মধ্যে একটি। কোর্স শেষে একজন ডেটা এনালিস্ট বা এআই স্পেশালিস্ট হিসেবে বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বছরে ১০ থেকে ২০ লক্ষ টাকা বেতনের চাকরি পাওয়া সম্ভব। প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে এই পেশার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
আর্কিটেকচার (বি.আর্ক)
বিজ্ঞানের সৃজনশীল ছাত্রছাত্রীদের জন্য ৫ বছরের ব্যাচেলর অফ আর্কিটেকচার একটি চমৎকার পথ। এর জন্য নাটা (NATA) বা জেইই পেপার-২ পরীক্ষায় বসতে হয়। ৫ বছরের খরচ ৫ থেকে ১০ লক্ষ টাকা হতে পারে। নিজস্ব ফার্ম খুলে বা বড় রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে আর্কিটেক্ট হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তোলা যায়।
বায়োটেকনোলজি ও মাইক্রোবায়োলজি
বর্তমান কালে বিজ্ঞান বিভাগের অন্যতম সেরা কেরিয়ার পাথ হিসেবে জিনতত্ত্ব, ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়া নিয়ে গবেষণার খুব চাহিদাসম্পন্ন একটি ক্ষেত্র।এই বিষয়ে ৩ বছরের স্নাতক ও ২ বছরের স্নাতকোত্তর করতে হয়। কোর্স শেষে বায়োটেকনোলজিস্ট হিসেবে বড় ল্যাবরেটরি বা ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী সংস্থায় কাজ করা যায়। এই পড়াশোনার খরচ বছরে ১ থেকে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
ফার্মাসি (বি.ফার্ম)
ওষুধ তৈরি ও গবেষণা নিয়ে যারা কাজ করতে চাও, তাদের জন্য ৪ বছরের বি.ফার্ম কোর্সটি সেরা। এই কোর্সে ভর্তি হতে জয়েন্ট এন্ট্রান্স বা নির্দিষ্ট প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে হয়। ৪ বছরের এই কোর্সের খরচ সরকারি ক্ষেত্রে কম হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৪ থেকে ৬ লক্ষ টাকা হতে পারে। কোর্স শেষ করে ড্রাগ ইন্সপেক্টর হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া যায় অথবা বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল ফার্মা কোম্পানিতে কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার হিসেবে কাজ করা যায়। এছাড়া নিজের ওষুধের দোকান বা উৎপাদন ইউনিট খোলার সুযোগ তো রয়েছেই।
আরও পড়ুনঃ উচ্চ মাধ্যমিকের পর কি নিয়ে পড়া উচিত?
বিএসসি নার্সিং
বর্তমানে সাইন্সের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিএসসি নার্সিং একটি গুরুত্বপূর্ণ কোর্স। ৪ বছরের এই ডিগ্রি কোর্সে ভর্তির জন্য আলাদা প্রবেশিকা পরীক্ষা ( JENPAS) দিতে হয়। এই কোর্সের খরচ ২ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকা হতে পারে। বর্তমানে ভারত ছাড়াও বিদেশে (যেমন ব্রিটেন, আমেরিকা, কানাডা) ভারতীয় নার্সদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। শুরুতে বেতন মাসে ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা হলেও অভিজ্ঞতা ও বিদেশের চাকরিতে এই বেতন কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
এগ্রিকালচারাল সায়েন্স
বিজ্ঞানের অনেক ছাত্র ছাত্রী রাই এগ্রিকালচারাল সাইন্স বা কৃষি বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে আগ্রহী থাকেন। কারণ এখানেও ভালো কেরিয়ার করার সুযোগ রয়েছে। ৪ বছরের বিএসসি ইন এগ্রিকালচার কোর্স করে কৃষি বিজ্ঞানী বা এগ্রিকালচার অফিসার হওয়া যায়। এই কোর্সের খরচ সরকারি কলেজে ৪ বছরে ১ লক্ষ টাকারও কম। সরকারি কৃষি দপ্তর ছাড়াও বিভিন্ন সার ও বীজ উৎপাদনকারী সংস্থায় ভালো বেতনের চাকরি পাওয়া যায়। এছাড়া বর্তমান সময়ে অর্গানিক ফার্মিং ও স্টার্টআপের মাধ্যমে কৃষি ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হওয়ার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
অ্যারোস্পেস ও অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
মহাকাশ বিজ্ঞান বা বিমান চলাচলের প্রযুক্তি নিয়ে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য এটি সেরা ক্যারিয়ার। ৪ বছরের এই ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের খরচ ৫ থেকে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ইসরো (ISRO), ডিআরডিও (DRDO) বা এয়ারবাসের মতো বিশ্ববিখ্যাত সংস্থায় বিজ্ঞানী বা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করার সুযোগ থাকে। এখানে বেতন ও সামাজিক মর্যাদা দুটিই অত্যন্ত বেশি।
ফরেনসিক সায়েন্স
আজকাল বিভিন্ন অপরাধ তদন্ত করতেও বিজ্ঞানের ব্যবহার হয়। আর সেই জন্য এই বিভাগেও সম্মানজনক কেরিয়ার তৈরির সুযোগ রয়েছে বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের কাছে। তারা ৩ বছরের বিএসসি ইন ফরেনসিক সায়েন্স কোর্স পড়তে পারে। এই কোর্সের খরচ ২ থেকে ৪ লক্ষ টাকা। কোর্স শেষে সিবিআই, পুলিশ বা ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করা যায়।
কমার্শিয়াল পাইলট
ছোট থেকে অনেকেরই পাইলট হওয়ার স্বপ্ন থাকে। পাইলটের ট্রেনিং নেওয়ার জন্য উচ্চমাধ্যমিকে ফিজিক্স ও ম্যাথ থাকা বাধ্যতামূলক। যারা পিওর সাইন্স নিয়ে পড়াশোনা করেন, তাদের জন্য এটি সুবর্ণ সুযোগ। এই কোর্সের খরচ বেশ বেশি, প্রায় ৪৫ থেকে ৬০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। তবে এয়ারলাইন্সগুলোতে পাইলট হিসেবে যোগ দিলে শুরুতে বেতন মাসে ১.৫ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ টাকা হয় এবং পরবর্তীকালে তা ৫-৮ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
গবেষণা
আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট বিষয় যেমন পদার্থবিদ্যা বা রসায়ন খুব ভালোবাসেন, তবে ৩ বছরের বিএসসি ও ২ বছরের এমএসসি করার পর নেট (NET) বা গেট (GATE) পরীক্ষা দিয়ে পিএইচডি করতে পারেন। গবেষণার সময় সরকার থেকে মাসে প্রায় ৩৭-৪২ হাজার টাকা স্টাইপেন্ড পাওয়া যায়। গবেষণা শেষে বিজ্ঞানী হিসেবে বা কলেজের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিতে পারেন।
মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং ও নটিক্যাল সায়েন্স
সমুদ্রের মাঝখানে জাহাজের ইঞ্জিন পরিচালনা বা জাহাজ চালানো নিয়ে ৪ বছরের মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বা ৩ বছরের নটিক্যাল সায়েন্স কোর্স শেখানো হয়। এই কোর্সের খরচ ৪ থেকে ৮ লক্ষ টাকা। তবে মার্চেন্ট নেভি জাতীয় ক্ষেত্রে চাকরি পেলে শুরুর বেতনই হয় মাসে ১ লক্ষ টাকার উপরে। ভবিষ্যতে প্রোমোশনের মাধ্যমে আরো বড়ো জায়গায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।






